, সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
নোটিশ :
সংবাদের বিষয়ে কিছু জানাতে ইমেইল করুন [email protected] ঠিকানায়

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে চায় বাংলাদেশ, বড় বাধা ভারত

নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১২:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ নভেম্বর ২০২৫
  • / ১২ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পরিকল্পনা করছে ঢাকাঃ এই বিষয়ে নানা আলোচনায় জড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি আদালত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য তার বিরুদ্ধে এই রায় প্রদান করে। তবে এই রায় বাস্তবায়নে প্রধান বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে ভারত। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এর প্রতিবেদনে জানা যায়, একসময় শেখ হাসিনা ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন বিপ্লবী নেতার কন্যা। ১৯৭০-এর দশকের শেষার্ধে বাবার নৃশংস হত্যাকাণ্ড তার রাজনৈতিক জীবনের পথ প্রশস্ত করে দেয়। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শীর্ষে ওঠার পর তার উত্থানের সাথে পতনের ঘটনার সূচনা হয়— ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে তিনি ক্ষমতা হারান এবং অবশেষে ভারতে পালিয়ে যান। বর্তমানে তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে পারে, যদি ভারত তাকে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৪ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন তিনি, যার ফলে তার সরকারের পতন ঘটে। এরপর দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে তিনি স্বৈরশাসন চালিয়ে যান। গত বছরের আগস্টে তিনি ভারতে পালিয়ে যান এবং একসময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দেশের রাজধানীতে আশ্রয় নেন। এখন তিনি দুই দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার তার ফেরত চাওয়া হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুবাশ্বর হাসান বলেন, “তিনি জনরোষ এড়াতে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। এখন তিনি ভারতে লুকিয়ে আছেন, আর মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন— এটা সত্যিই বিরল ঘটনা।”

অতীতের কলঙ্কময় অধ্যায়ঃ
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন শেক্সপিয়রের ট্র্যাজেডির মতো— বেদনা, নির্বাসন এবং ক্ষমতার জন্য সংগ্রাম। এই সবকিছু বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে গভীরভাবে জড়িত। শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবে তিনি স্বাধীনতার সংগ্রাম দেখেছেন। তবে তার জীবনকে বদলে দেয় ১৯৭৫ সালের আগস্টের এক রক্তাক্ত রাত— সেনা অভ্যুত্থানে তার বাবা, মা ও তিন ভাইকে হত্যা করে সেনা কর্মকর্তারা। তখন তিনি ও তার বোন পশ্চিম জার্মানিতে থাকায় বেঁচে যান। এই সময়ে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করেন, যিনি পরবর্তীতে হাসিনার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়ার স্বামী ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের পর রাতারাতি তিনি নির্বাসিত হন। ছয় বছর তিনি ভারতে থাকেন, যা ভবিষ্যতের জন্য ভারতের প্রতি তার আস্থা বাড়ায়। ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর তিনি দেখেন, জনগণ তার জন্য নতুন আশা নিয়ে অপেক্ষা করছে। অন্যদিকে, রাজনীতিতে প্রবেশ করেন আরেকটি ট্র্যাজেডির প্রতিনিধি— খালেদা জিয়া। দেশে ফেরার পর হাসিনা বলেন, “বিমানবন্দরে নামার পর আমি কাউকে পাইনি, কিন্তু লাখো মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি— এটাই ছিল আমার শক্তির উৎস।” এরপর শুরু হয় “দুই বেগমের লড়াই”।

ক্ষমতার সংগ্রামঃ
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের জন্য দীর্ঘদিন সংগ্রাম চালান হাসিনা। গৃহবন্দী, দমন-পীড়ন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে তিনি এই পথ অতিক্রম করেন। ১৯৯৬ সালে তার দল নির্বাচনে জয়লাভ করলে তিনি প্রথমবারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের সাথে সাথেই তিনি ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু করেন। তবে, ধর্মনিরপেক্ষ মুসলিম নেত্রী হিসেবে তিনি এক মেয়াদে ক্ষমতা হারান। ২০০৮ সালে আবার ক্ষমতা ফিরে পান, এবার আরও দৃঢ়, আস্থাহীনতা কমে, স্থায়ী ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। পরবর্তী ১৫ বছর তিনি কঠোর হাতে দেশ চালান। একদিকে অর্থনৈতিক দ্রুত উন্নতি, অন্যদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘন, মিডিয়া ও বিরোধী দলের দমন-পীড়ন বাড়তে থাকে। ভারতের সাথে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করে তিনি প্রতিবেশী হিসেবে দিল্লির গুরুত্ব বাড়ান, যা পাকিস্তান ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের জন্য সুবিধাজনক ছিল। তবে দেশের ভিতরে দমননীতির বাড়বাড়ন্তে সমালোচকরা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ একদলীয় শাসনের দিকে এগোচ্ছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, চাপের মুখে হাসিনা শুধুমাত্র “ভারতের বিনা শর্তে সমর্থনের ওপর ভরসা রাখতে শুরু করেন।”

বিশ্ববিদ্যালয়-আন্দোলনে পতনঃ
বহু আন্দোলন ও হত্যাচেষ্টার পরেও হাসিনার ক্ষমতা অটুট থাকলেও, গত বছরের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছিল অন্যরকম। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার ও নিয়মের জন্য দেশজুড়ে উতপ্ত বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সরকারের কঠোর দমন-পীড়নের ফলে জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী ১৪০০ মানুষ নিহত হয়। তবে এই সহিংসতা আন্দোলন থামাতে পারেনি; বরং তা আরও জোরদার করে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের পতন ঘটে। মুবাশ্বর হাসান বলেন, “তিনি দেশ ছেড়ে চলে গেছেন— এটি তার অপরাধের স্বীকারোক্তি। তিনি অনেক বেশি সীমা লঙ্ঘন করেছিলেন।”

মৃত্যুদণ্ডের রায়ঃ
ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়া তার জীবনের আরেকটি পর্ব সম্পন্ন করে। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর আবারও তিনি দেশটিতে নির্বাসিত হন। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার অনুপস্থিতিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। অভিযোগ ছিল: বিক্ষোভকারীদের হত্যা করতে উসকানি দেওয়া, ফাঁসির আদেশ দেওয়া, ড্রোন, অস্ত্র, হেলিকপ্টার দিয়ে দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়া। আদালত জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের হত্যা করার নির্দেশ তিনি দিয়েছেন এবং সেটা পরিষ্কার। রায় ঘোষণার সময় আদালত প্রাঙ্গণে কান্না ও করতালির ঝড় ওঠে। নিহত এক আন্দোলনকারীর বাবা আবদুর রব বললেন, “এতে কিছুটা শান্তি পেলাম। পুরো শান্তি তখনই আসবে যখন তাকে ফাঁসির দড়িতে দেখা যাবে।” ভারত এই রায়কে স্বীকৃতি দিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছে। হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ বলেন, “ভারত সর্বদা ভালো বন্ধু। তারা আমার মায়ের জীবন বাঁচিয়েছে।” ভারতের সাবেক কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়েত বলেছেন, “ভারত তাকে ফেরত পাঠাবে কিনা আমি খুবই সন্দিহান।” ভারতের আইন ও বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ‘রাজনৈতিক অপরাধে’ কাউকে ফেরত পাঠানো হয় না। হয়তো ভারতও সেই যুক্তি নিয়েই সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি আরও বলেন, “ভারত হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করবে।” ত্রিগুনায়েত আরও বলেছেন, হাসিনা এখনও সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ করেননি, তিনি সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারেন, এমনকি হেগেও যেতে পারেন। তাই ভারত তাড়াহুড়ো করবে না।

রায়ের পরের দিন বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুত হাসিনাকে ফিরিয়ে দিতে ভারতের কাছে আবারও চিঠি পাঠিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, “হাসিনাকে ফেরত দেওয়া ভারতের দায়িত্ব।”

পরবর্তী রাজনৈতিক ভবিষ্যৎঃ
আগামী ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে এই মৃত্যুদণ্ড বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। আওয়ামী লীগ বর্তমানে নিষিদ্ধ, নেতৃত্বের ঠিকানা অনিশ্চিত। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন মধ্যবর্তী সরকার রাজনৈতিক বিভাজন দূর করার চেষ্টায় লিপ্ত। এই পরিস্থিতি থেকে সুবিধা নিতে পারে বিএনপি ও অন্যান্য দলগুলো। আবারও ক্ষমতায় ফিরতে চাইবে আওয়ামী লীগ— তবে হয়তো হাসিনার নেতৃত্বে নয়। এখন প্রশ্ন,— হাসিনার পতন কি বিষাক্ত যুগের অবসান, নাকি নতুন এক অনিশ্চয়তার সূচনা?


প্রিন্ট
ট্যাগস

নিউজটি শেয়ার করুন

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে চায় বাংলাদেশ, বড় বাধা ভারত

আপডেট সময় ১২:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ নভেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পরিকল্পনা করছে ঢাকাঃ এই বিষয়ে নানা আলোচনায় জড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি আদালত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য তার বিরুদ্ধে এই রায় প্রদান করে। তবে এই রায় বাস্তবায়নে প্রধান বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে ভারত। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এর প্রতিবেদনে জানা যায়, একসময় শেখ হাসিনা ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন বিপ্লবী নেতার কন্যা। ১৯৭০-এর দশকের শেষার্ধে বাবার নৃশংস হত্যাকাণ্ড তার রাজনৈতিক জীবনের পথ প্রশস্ত করে দেয়। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শীর্ষে ওঠার পর তার উত্থানের সাথে পতনের ঘটনার সূচনা হয়— ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে তিনি ক্ষমতা হারান এবং অবশেষে ভারতে পালিয়ে যান। বর্তমানে তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে পারে, যদি ভারত তাকে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৪ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন তিনি, যার ফলে তার সরকারের পতন ঘটে। এরপর দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে তিনি স্বৈরশাসন চালিয়ে যান। গত বছরের আগস্টে তিনি ভারতে পালিয়ে যান এবং একসময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দেশের রাজধানীতে আশ্রয় নেন। এখন তিনি দুই দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার তার ফেরত চাওয়া হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুবাশ্বর হাসান বলেন, “তিনি জনরোষ এড়াতে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। এখন তিনি ভারতে লুকিয়ে আছেন, আর মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন— এটা সত্যিই বিরল ঘটনা।”

অতীতের কলঙ্কময় অধ্যায়ঃ
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন শেক্সপিয়রের ট্র্যাজেডির মতো— বেদনা, নির্বাসন এবং ক্ষমতার জন্য সংগ্রাম। এই সবকিছু বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে গভীরভাবে জড়িত। শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবে তিনি স্বাধীনতার সংগ্রাম দেখেছেন। তবে তার জীবনকে বদলে দেয় ১৯৭৫ সালের আগস্টের এক রক্তাক্ত রাত— সেনা অভ্যুত্থানে তার বাবা, মা ও তিন ভাইকে হত্যা করে সেনা কর্মকর্তারা। তখন তিনি ও তার বোন পশ্চিম জার্মানিতে থাকায় বেঁচে যান। এই সময়ে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করেন, যিনি পরবর্তীতে হাসিনার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়ার স্বামী ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের পর রাতারাতি তিনি নির্বাসিত হন। ছয় বছর তিনি ভারতে থাকেন, যা ভবিষ্যতের জন্য ভারতের প্রতি তার আস্থা বাড়ায়। ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর তিনি দেখেন, জনগণ তার জন্য নতুন আশা নিয়ে অপেক্ষা করছে। অন্যদিকে, রাজনীতিতে প্রবেশ করেন আরেকটি ট্র্যাজেডির প্রতিনিধি— খালেদা জিয়া। দেশে ফেরার পর হাসিনা বলেন, “বিমানবন্দরে নামার পর আমি কাউকে পাইনি, কিন্তু লাখো মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি— এটাই ছিল আমার শক্তির উৎস।” এরপর শুরু হয় “দুই বেগমের লড়াই”।

ক্ষমতার সংগ্রামঃ
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের জন্য দীর্ঘদিন সংগ্রাম চালান হাসিনা। গৃহবন্দী, দমন-পীড়ন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে তিনি এই পথ অতিক্রম করেন। ১৯৯৬ সালে তার দল নির্বাচনে জয়লাভ করলে তিনি প্রথমবারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের সাথে সাথেই তিনি ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু করেন। তবে, ধর্মনিরপেক্ষ মুসলিম নেত্রী হিসেবে তিনি এক মেয়াদে ক্ষমতা হারান। ২০০৮ সালে আবার ক্ষমতা ফিরে পান, এবার আরও দৃঢ়, আস্থাহীনতা কমে, স্থায়ী ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। পরবর্তী ১৫ বছর তিনি কঠোর হাতে দেশ চালান। একদিকে অর্থনৈতিক দ্রুত উন্নতি, অন্যদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘন, মিডিয়া ও বিরোধী দলের দমন-পীড়ন বাড়তে থাকে। ভারতের সাথে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করে তিনি প্রতিবেশী হিসেবে দিল্লির গুরুত্ব বাড়ান, যা পাকিস্তান ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের জন্য সুবিধাজনক ছিল। তবে দেশের ভিতরে দমননীতির বাড়বাড়ন্তে সমালোচকরা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ একদলীয় শাসনের দিকে এগোচ্ছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, চাপের মুখে হাসিনা শুধুমাত্র “ভারতের বিনা শর্তে সমর্থনের ওপর ভরসা রাখতে শুরু করেন।”

বিশ্ববিদ্যালয়-আন্দোলনে পতনঃ
বহু আন্দোলন ও হত্যাচেষ্টার পরেও হাসিনার ক্ষমতা অটুট থাকলেও, গত বছরের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছিল অন্যরকম। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার ও নিয়মের জন্য দেশজুড়ে উতপ্ত বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সরকারের কঠোর দমন-পীড়নের ফলে জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী ১৪০০ মানুষ নিহত হয়। তবে এই সহিংসতা আন্দোলন থামাতে পারেনি; বরং তা আরও জোরদার করে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের পতন ঘটে। মুবাশ্বর হাসান বলেন, “তিনি দেশ ছেড়ে চলে গেছেন— এটি তার অপরাধের স্বীকারোক্তি। তিনি অনেক বেশি সীমা লঙ্ঘন করেছিলেন।”

মৃত্যুদণ্ডের রায়ঃ
ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়া তার জীবনের আরেকটি পর্ব সম্পন্ন করে। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর আবারও তিনি দেশটিতে নির্বাসিত হন। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার অনুপস্থিতিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। অভিযোগ ছিল: বিক্ষোভকারীদের হত্যা করতে উসকানি দেওয়া, ফাঁসির আদেশ দেওয়া, ড্রোন, অস্ত্র, হেলিকপ্টার দিয়ে দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়া। আদালত জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের হত্যা করার নির্দেশ তিনি দিয়েছেন এবং সেটা পরিষ্কার। রায় ঘোষণার সময় আদালত প্রাঙ্গণে কান্না ও করতালির ঝড় ওঠে। নিহত এক আন্দোলনকারীর বাবা আবদুর রব বললেন, “এতে কিছুটা শান্তি পেলাম। পুরো শান্তি তখনই আসবে যখন তাকে ফাঁসির দড়িতে দেখা যাবে।” ভারত এই রায়কে স্বীকৃতি দিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছে। হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ বলেন, “ভারত সর্বদা ভালো বন্ধু। তারা আমার মায়ের জীবন বাঁচিয়েছে।” ভারতের সাবেক কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়েত বলেছেন, “ভারত তাকে ফেরত পাঠাবে কিনা আমি খুবই সন্দিহান।” ভারতের আইন ও বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ‘রাজনৈতিক অপরাধে’ কাউকে ফেরত পাঠানো হয় না। হয়তো ভারতও সেই যুক্তি নিয়েই সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি আরও বলেন, “ভারত হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করবে।” ত্রিগুনায়েত আরও বলেছেন, হাসিনা এখনও সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ করেননি, তিনি সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারেন, এমনকি হেগেও যেতে পারেন। তাই ভারত তাড়াহুড়ো করবে না।

রায়ের পরের দিন বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুত হাসিনাকে ফিরিয়ে দিতে ভারতের কাছে আবারও চিঠি পাঠিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, “হাসিনাকে ফেরত দেওয়া ভারতের দায়িত্ব।”

পরবর্তী রাজনৈতিক ভবিষ্যৎঃ
আগামী ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে এই মৃত্যুদণ্ড বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। আওয়ামী লীগ বর্তমানে নিষিদ্ধ, নেতৃত্বের ঠিকানা অনিশ্চিত। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন মধ্যবর্তী সরকার রাজনৈতিক বিভাজন দূর করার চেষ্টায় লিপ্ত। এই পরিস্থিতি থেকে সুবিধা নিতে পারে বিএনপি ও অন্যান্য দলগুলো। আবারও ক্ষমতায় ফিরতে চাইবে আওয়ামী লীগ— তবে হয়তো হাসিনার নেতৃত্বে নয়। এখন প্রশ্ন,— হাসিনার পতন কি বিষাক্ত যুগের অবসান, নাকি নতুন এক অনিশ্চয়তার সূচনা?


প্রিন্ট