, সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
নোটিশ :
সংবাদের বিষয়ে কিছু জানাতে ইমেইল করুন [email protected] ঠিকানায়

কৃষিজমি বাঁচাতে পরিকল্পিত গ্রাম উন্নয়ন জরুরি : প্রেস সচিব

নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০৬:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫
  • / ৫ বার পড়া হয়েছে

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উল্লেখ করেছেন, চীন পাট শিল্পে ব্যাপক পরিমাণে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও সম্ভাবনাময় এই খাতের কেন্দ্র করে চীনারা কাঁচা পাট থেকে শুরু করে প্রস্তুত পাটপণ্যসহ সব ধরণের কাজে যৌথ উদ্যোগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং আধুনিক উৎপাদন সুবিধা গড়ে তুলতে চাচ্ছেন। আমরা বিশ্বাস করি, এই আগ্রহ সফল হলে দেশের পাট শিল্পে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে। শনিবার (২৯ নভেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরাম (বিএজেএফ) এর চার দিনব্যাপী কৃষি ও খাদ্য বিষয়ক রাজনৈতিক অঙ্গীকার সম্মেলনের ‘কৃষি ও খাদ্যে বিনিয়োগ : মানসম্পন্ন কৃষি উপকরণ ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং কৃষির বাণিজ্যিকীকরণে ভ্যালুচেইন গঠন’ শীর্ষক অধিবেশনে তিনি এ কথা বলেন। শফিকুল আলম বলেন, জুট ডাইভারসিফিকেশন নিয়ে আমরা যতই আলোচনা করি, বাস্তবে তেমন কিছু অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। কারণ, জুট রটিং বা পচানো এখন আর কেউ করতে চান না। পুরনো জটিল পদ্ধতিগুলো মানুষের আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। তবে চীনা বিনিয়োগকারীরা আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে বাংলাদেশে এক মিলিয়ন টন জুট প্রক্রিয়াকরণ, বায়োফার্টিলাইজার, এনার্জি সাশ্রয়ী প্লাস্টিকের বিকল্প তৈরি করতে আগ্রহী। সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহারে জুট আবারও বড় বাজার দখল করতে পারে। কারণ, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি নির্ধারণে কৃষি খাতের ভূমিকা অগ্রণী। কৃষি কেবল খাদ্য নিরাপত্তা নয়, বরং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কথা উল্লেখ করে বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছরে বাংলাদেশের সবচেয়ে মারাত্মক বছর ছিল ১৯৭৪। ড. নামি হোসেনের সাম্প্রতিক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, সেই দুর্ভিক্ষে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। তিনি বলেন, তখনকার সরকারের অদক্ষতা, দুর্বল রিজার্ভ, বৈশ্বিক কৃষিপণ্য রাজনীতি ও বাজারব্যবস্থার ব্যর্থতা দুর্ভিক্ষ আরও তীব্র করে তোলে। একইসঙ্গে খাদ্য মজুতদারি ও অস্থিতিশীল বাজার পরিস্থিতি সংকটের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারের নীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তাছাড়া, খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য বৈশ্বিক টানাপোড়েনে পরিস্থিতি দ্রুত সংকটে পরিণত হতে পারে। তিনি আরও জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ ৬ থেকে ৮ মিলিয়ন টন খাদ্য ঘাটতি পূরণের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল। তবে, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বা কোনো দেশের হঠাৎ রপ্তানি বন্ধের কারণে খাদ্য আমদানি কঠিন হয়ে পড়ে। তাই খাদ্য নিরাপত্তার জন্য শক্তিশালী রিজার্ভ, পর্যাপ্ত স্টক ও দ্রুত আমদানির সক্ষমতা অপরিহার্য। তিনি বর্তমান সরকারের কৃষি অগ্রাধিকারের কথা উল্লেখ করে বলেন, প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনুস স্পষ্টভাবে বলেছেন, বাংলাদেশকে নেদারল্যান্ডের মতো কৃষিতে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন বাড়াতে হবে। নেদারল্যান্ড ছোট হলেও বছরে ১৩৩ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য রপ্তানি করে। বাংলাদেশেরও সীমিত জমিতে উৎপাদন দ্বিগুণ বা ত্রিগুণ বাড়ানো সম্ভব। তবে কেবল উৎপাদন বাড়লেই হবে না—ক্ষুদ্র কৃষকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। তিনি বলেন, হঠাৎ করে বড় আকারে ফসল উঠলে দাম কমে যায় এবং কৃষক ন্যায্য মূল্য পান না। এজন্য প্রত্যেক গ্রামে ছোট আকারে ঠান্ডা স্টোরেজ, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, নতুন বাজার ও রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কৃষি, রাজনীতি ও বৈশ্বিক বাণিজ্য একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। যেমন— চীন–যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন সংকটের সময় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন আমদানি করে, যা নতুন ধরনের কূটনীতি। স্টোরেজ সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে ২০ লাখ টন শস্য সংরক্ষণ হয়। এটি বাড়িয়ে ৫০ লাখ টনে নিয়ে গেলে বৈশ্বিক সংকটের সময় বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণাক্ততা, জমির ব্যবহার কমে যাওয়া ইত্যাদি বিষয় মাথায় রেখে নতুন জাত, প্রযুক্তি ও গবেষণা জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি। আবাসন ও বিস্তারে কৃষিজমি হারানোর কঠোর সমালোচনা করে বলেন, গ্রামাঞ্চলের বাড়িঘর ফাঁকা পড়ে থাকা সত্ত্বেও কৃষিজমি ক্রমশ কমে যাচ্ছে—এটি মোকাবিলায় পরিকল্পিত গ্রাম উন্নয়ন জরুরি। ভবিষ্যতে কৃষির বাইরে কিছু নয়, উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে সরকার বা নীতিনির্ধারকই আসুক, তাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, উদ্বৃত্ত উৎপাদন এবং কৃষিজমি ও কৃষককে রক্ষা করা। আমাদের হয়তো নেদারল্যান্ডের মতো না হয়, কিন্তু লক্ষ্য স্থির রেখে ১০ বছরে অনেক কিছু সম্ভব। সম্মেলনের বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পার্টনার প্রোগ্রামের এজেন্সি ডিরেক্টর ও উপসচিব ড. মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফারুক। তিনি বলেন, বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও বাজার সংযোগ ও বিপণন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে কৃষক ন্যায্য মূল্য পান না। পার্টনার প্রকল্পের ১০টি ডিএলআই বাস্তবায়নে সাতটি সরকারি সংস্থা যুক্ত থাকলেও সমন্বয় অভাবে সমস্যা দেখা দেয়। গ্যাপভিত্তিক নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, ভ্যালুচেইন উন্নয়ন ও বাজার ব্যবস্থা শক্তিশালী করার মাধ্যমে কৃষকের প্রকৃত লাভ নিশ্চিত করা এখন জরুরি। এক্সপোর্ট ও প্রাইভেট সেক্টর কনসাল্টেন্ট ড. মো. মাহবুবুল আলম উল্লেখ করেন, পার্টনার কর্মসূচির মাধ্যমে সারাদেশে ২০ হাজার কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি করা হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, ইনকিউবেশন, সার্টিফিকেশন ও যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ৬০ শতাংশ আসনে সংরক্ষণ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি, আটটি বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও ১৯টি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে উদ্যোক্তাদের ভ্যালুচেইনে প্রবেশের পথ সহজ করা হয়েছে। উৎপাদিত পণ্যের মাত্র পাঁচ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত হয়, যার ফলে খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বড় সম্ভাবনা রয়েছে। প্রবন্ধ উপস্থাপনে পার্টনার প্রকল্পের (ডিএএম উইং) সিনিয়র মনিটরিং অফিসার মো. বায়েজিদ বোস্তামী বলেন, কৃষি ব্যবসায় যুবক ও নারীদের সম্পৃক্ত করে ২০ হাজার উদ্যোক্তা গড়ে তোলা হচ্ছে এবং পাঁচটি মূল কৃষিপণ্যের ভ্যালুচেইন শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কাজ চলছে। আম, আলু, কাঁঠাল, টমেটো ও সুগন্ধি চাল এই পাঁচ পণ্যে ভ্যালুচেইন গঠনের জন্য নীতিমালা ও কাঠামো তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে ৪২৬টি ম্যাপস ও ৬৬টি উপজেলা সংগঠন গঠন করা হয়েছে। এসব কাঠামো উৎপাদক থেকে বাজার পর্যন্ত সংযোগ বাড়াবে এবং রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়াবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সম্মেলনে বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আবু খালিদির পরিচালনায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি সাহানোয়ার সাঈদ শাহীনের।

বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরামের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকাট্রিবিউনের সম্পাদক ও বিএজেএফের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য রিয়াজ আহমেদ, কৃষি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব রেজাউল করিম সিদ্দিক, সাবেক সভাপতি ও ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান সম্পাদক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ, ও বর্তমান সভাপতি সাহানোয়ার সাঈদ শাহীনের হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, চার দিনব্যাপী এই সম্মেলনের কো-স্পন্সর ছিল আস্থা ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। সহযোগী হিসেবে ছিল প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, লাল তীর সিডস লিমিটেড, ওয়ার্ল্ড পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন–বাংলাদেশ ব্রাঞ্চ, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বন অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।


প্রিন্ট
ট্যাগস

নিউজটি শেয়ার করুন

কৃষিজমি বাঁচাতে পরিকল্পিত গ্রাম উন্নয়ন জরুরি : প্রেস সচিব

আপডেট সময় ০৬:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উল্লেখ করেছেন, চীন পাট শিল্পে ব্যাপক পরিমাণে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও সম্ভাবনাময় এই খাতের কেন্দ্র করে চীনারা কাঁচা পাট থেকে শুরু করে প্রস্তুত পাটপণ্যসহ সব ধরণের কাজে যৌথ উদ্যোগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং আধুনিক উৎপাদন সুবিধা গড়ে তুলতে চাচ্ছেন। আমরা বিশ্বাস করি, এই আগ্রহ সফল হলে দেশের পাট শিল্পে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে। শনিবার (২৯ নভেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরাম (বিএজেএফ) এর চার দিনব্যাপী কৃষি ও খাদ্য বিষয়ক রাজনৈতিক অঙ্গীকার সম্মেলনের ‘কৃষি ও খাদ্যে বিনিয়োগ : মানসম্পন্ন কৃষি উপকরণ ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং কৃষির বাণিজ্যিকীকরণে ভ্যালুচেইন গঠন’ শীর্ষক অধিবেশনে তিনি এ কথা বলেন। শফিকুল আলম বলেন, জুট ডাইভারসিফিকেশন নিয়ে আমরা যতই আলোচনা করি, বাস্তবে তেমন কিছু অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। কারণ, জুট রটিং বা পচানো এখন আর কেউ করতে চান না। পুরনো জটিল পদ্ধতিগুলো মানুষের আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। তবে চীনা বিনিয়োগকারীরা আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে বাংলাদেশে এক মিলিয়ন টন জুট প্রক্রিয়াকরণ, বায়োফার্টিলাইজার, এনার্জি সাশ্রয়ী প্লাস্টিকের বিকল্প তৈরি করতে আগ্রহী। সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহারে জুট আবারও বড় বাজার দখল করতে পারে। কারণ, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি নির্ধারণে কৃষি খাতের ভূমিকা অগ্রণী। কৃষি কেবল খাদ্য নিরাপত্তা নয়, বরং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কথা উল্লেখ করে বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছরে বাংলাদেশের সবচেয়ে মারাত্মক বছর ছিল ১৯৭৪। ড. নামি হোসেনের সাম্প্রতিক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, সেই দুর্ভিক্ষে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। তিনি বলেন, তখনকার সরকারের অদক্ষতা, দুর্বল রিজার্ভ, বৈশ্বিক কৃষিপণ্য রাজনীতি ও বাজারব্যবস্থার ব্যর্থতা দুর্ভিক্ষ আরও তীব্র করে তোলে। একইসঙ্গে খাদ্য মজুতদারি ও অস্থিতিশীল বাজার পরিস্থিতি সংকটের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারের নীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তাছাড়া, খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য বৈশ্বিক টানাপোড়েনে পরিস্থিতি দ্রুত সংকটে পরিণত হতে পারে। তিনি আরও জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ ৬ থেকে ৮ মিলিয়ন টন খাদ্য ঘাটতি পূরণের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল। তবে, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বা কোনো দেশের হঠাৎ রপ্তানি বন্ধের কারণে খাদ্য আমদানি কঠিন হয়ে পড়ে। তাই খাদ্য নিরাপত্তার জন্য শক্তিশালী রিজার্ভ, পর্যাপ্ত স্টক ও দ্রুত আমদানির সক্ষমতা অপরিহার্য। তিনি বর্তমান সরকারের কৃষি অগ্রাধিকারের কথা উল্লেখ করে বলেন, প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনুস স্পষ্টভাবে বলেছেন, বাংলাদেশকে নেদারল্যান্ডের মতো কৃষিতে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন বাড়াতে হবে। নেদারল্যান্ড ছোট হলেও বছরে ১৩৩ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য রপ্তানি করে। বাংলাদেশেরও সীমিত জমিতে উৎপাদন দ্বিগুণ বা ত্রিগুণ বাড়ানো সম্ভব। তবে কেবল উৎপাদন বাড়লেই হবে না—ক্ষুদ্র কৃষকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। তিনি বলেন, হঠাৎ করে বড় আকারে ফসল উঠলে দাম কমে যায় এবং কৃষক ন্যায্য মূল্য পান না। এজন্য প্রত্যেক গ্রামে ছোট আকারে ঠান্ডা স্টোরেজ, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, নতুন বাজার ও রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কৃষি, রাজনীতি ও বৈশ্বিক বাণিজ্য একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। যেমন— চীন–যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন সংকটের সময় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন আমদানি করে, যা নতুন ধরনের কূটনীতি। স্টোরেজ সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে ২০ লাখ টন শস্য সংরক্ষণ হয়। এটি বাড়িয়ে ৫০ লাখ টনে নিয়ে গেলে বৈশ্বিক সংকটের সময় বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণাক্ততা, জমির ব্যবহার কমে যাওয়া ইত্যাদি বিষয় মাথায় রেখে নতুন জাত, প্রযুক্তি ও গবেষণা জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি। আবাসন ও বিস্তারে কৃষিজমি হারানোর কঠোর সমালোচনা করে বলেন, গ্রামাঞ্চলের বাড়িঘর ফাঁকা পড়ে থাকা সত্ত্বেও কৃষিজমি ক্রমশ কমে যাচ্ছে—এটি মোকাবিলায় পরিকল্পিত গ্রাম উন্নয়ন জরুরি। ভবিষ্যতে কৃষির বাইরে কিছু নয়, উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে সরকার বা নীতিনির্ধারকই আসুক, তাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, উদ্বৃত্ত উৎপাদন এবং কৃষিজমি ও কৃষককে রক্ষা করা। আমাদের হয়তো নেদারল্যান্ডের মতো না হয়, কিন্তু লক্ষ্য স্থির রেখে ১০ বছরে অনেক কিছু সম্ভব। সম্মেলনের বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পার্টনার প্রোগ্রামের এজেন্সি ডিরেক্টর ও উপসচিব ড. মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফারুক। তিনি বলেন, বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও বাজার সংযোগ ও বিপণন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে কৃষক ন্যায্য মূল্য পান না। পার্টনার প্রকল্পের ১০টি ডিএলআই বাস্তবায়নে সাতটি সরকারি সংস্থা যুক্ত থাকলেও সমন্বয় অভাবে সমস্যা দেখা দেয়। গ্যাপভিত্তিক নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, ভ্যালুচেইন উন্নয়ন ও বাজার ব্যবস্থা শক্তিশালী করার মাধ্যমে কৃষকের প্রকৃত লাভ নিশ্চিত করা এখন জরুরি। এক্সপোর্ট ও প্রাইভেট সেক্টর কনসাল্টেন্ট ড. মো. মাহবুবুল আলম উল্লেখ করেন, পার্টনার কর্মসূচির মাধ্যমে সারাদেশে ২০ হাজার কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি করা হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, ইনকিউবেশন, সার্টিফিকেশন ও যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ৬০ শতাংশ আসনে সংরক্ষণ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি, আটটি বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও ১৯টি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে উদ্যোক্তাদের ভ্যালুচেইনে প্রবেশের পথ সহজ করা হয়েছে। উৎপাদিত পণ্যের মাত্র পাঁচ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত হয়, যার ফলে খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বড় সম্ভাবনা রয়েছে। প্রবন্ধ উপস্থাপনে পার্টনার প্রকল্পের (ডিএএম উইং) সিনিয়র মনিটরিং অফিসার মো. বায়েজিদ বোস্তামী বলেন, কৃষি ব্যবসায় যুবক ও নারীদের সম্পৃক্ত করে ২০ হাজার উদ্যোক্তা গড়ে তোলা হচ্ছে এবং পাঁচটি মূল কৃষিপণ্যের ভ্যালুচেইন শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কাজ চলছে। আম, আলু, কাঁঠাল, টমেটো ও সুগন্ধি চাল এই পাঁচ পণ্যে ভ্যালুচেইন গঠনের জন্য নীতিমালা ও কাঠামো তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে ৪২৬টি ম্যাপস ও ৬৬টি উপজেলা সংগঠন গঠন করা হয়েছে। এসব কাঠামো উৎপাদক থেকে বাজার পর্যন্ত সংযোগ বাড়াবে এবং রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়াবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সম্মেলনে বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আবু খালিদির পরিচালনায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি সাহানোয়ার সাঈদ শাহীনের।

বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরামের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকাট্রিবিউনের সম্পাদক ও বিএজেএফের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য রিয়াজ আহমেদ, কৃষি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব রেজাউল করিম সিদ্দিক, সাবেক সভাপতি ও ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান সম্পাদক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ, ও বর্তমান সভাপতি সাহানোয়ার সাঈদ শাহীনের হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, চার দিনব্যাপী এই সম্মেলনের কো-স্পন্সর ছিল আস্থা ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। সহযোগী হিসেবে ছিল প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, লাল তীর সিডস লিমিটেড, ওয়ার্ল্ড পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন–বাংলাদেশ ব্রাঞ্চ, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বন অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।


প্রিন্ট